Fenton Zawiya, Michigan
গ্র্যান্ডশেখ আবদুল্লাহ দাগেস্তানি قَدَّسَ اللّٰهُ سِرَّهُ আমাদেরকে কুব্বাত-উল-আরজাক সম্বন্ধে বলছিলেন - আল্লাহ্র রিজিকের গম্বুজ - যেখানকার ফেরেশতারা অন্য সব ফেরেশতা থেকে আলাদা। যে তাদেরকে দেখতে পায় সে বুঝে ফেলে নিমেষেই - যে, এই ফেরেশতারা আল্লাহ্র রাসুলের ﷺ জন্য নির্দিষ্ট করে রাখা - যেভাবে একটা দেশের প্রেসিডেন্ট বা প্রধান মন্ত্রীর জন্য সিক্রেট সার্ভিসের বডিগার্ড আলাদা করে রাখা থাকে। তাদের গাড়িগুলো দেখলেই সবাই সরে যায়। তুমি কখনই জানবে না ওই এজেন্টগুলো কারা - তাদের নাম কি, কালো চশমার আড়ালে তাদের চোখগুলো আসলে ঠিক কেমন। তেমনি কুব্বাত-উল-আরজাকের ফেরেশতাদের সম্বন্ধেও কেউ জানে না - না কোন নবী - না অন্য কোন ফেরেশতা। তাদের বৈশিষ্ট আর শক্তি সবার কাছ থেকে গোপন করে রাখা আছে। কেবল আল্লাহ্র নবী ﷺ তাদের সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন। 'লা কাথরা ওয়া জিয়াদা আদ্দাহুম', বিপুল সংখ্যায় ফেরেশতারা আসমান থেকে নেমে আসে যখন মানুষ আল্লাহ্র জিকিরের উদ্দেশ্যে একজোট হয়। কিন্তু কুব্বাত-উল-আরজাকের ফেরেশতারা একেবারেই ভিন্ন। তারা নেমে আসে আর সেই মানুষগুলোকে ঘিরে ফেলে - যারা কিনা আল্লাহ্র পেয়ারি হাবীবের ﷺ মিলাদের উদ্দেশ্যে একজোট হয়। তুমি আল্লাহ্র নবীর ﷺ প্রতি যতই দরূদ শরীফ, সালাওয়াত, কাসিদা, নাত-এ-রাসুল ﷺ, মিলাদ-উন-নবী ﷺ প্রেরণ করো না কেন - এই ফেরেশতারা সেই সমস্ত কিছু তোমার কাছ থেকে প্রথমে গ্রহণ করে এবং তারপর সেগুলোকে ধুয়ে মুছে নিখুঁত করে নবীর ﷺ সামনে উপস্থাপন করে।
তুমি যখন কাউকে কোনো কিছু উপহার দাও - তুমি কি করো? বাজার থেকে কিনে এনে সেভাবেই দিয়ে দাও? নাকি সুন্দর কাগজ দিয়ে মুড়িয়ে পরিপাটি করে সুন্দর একটা পরিবেশ তৈরি করার চেষ্টা করো - তাকে সেখানে দাওয়াত করে শেষমেশ তার সামনে সেই উপহারটাকে নম্রতার সাথে তুলে ধরো? আল্লাহ্র রাসুলের ﷺ জন্য আমাদের উপহার হলো স্যুপের মতো - যার ভেতরে আমাদের অহংকার আর পাপ মিলে মিশে থাকে। আমরা দরূদ শরীফ পড়তে থাকি - কিন্তু অন্তর সেখানে হাজিরও নাই - নাজিরও নাই। তাই এই ফেরেশতারা সেগুলোকে পাকসাফ করে - বেহেশতি ফর্মুলায়। সুন্দর করে ধুয়ে মুছে মুড়িয়ে তারপর আল্লাহ্র রাসুলের ﷺ সামনে গিয়ে উপস্থাপন করে। যে কিনা মিলাদ পড়ছে আল্লাহ্র হাবীবের ﷺ ভালবাসায় - সে যেন ওই অপূর্ব সুন্দর উপহার গুলো রওজাতুল মুতাহহারা (রওজাতুল জান্নাহ, রওজাতুন্নবী ﷺ) - একেবারে সেখানে গিয়ে নবীর ﷺ নামে প্রশংসার গীত গাইছে - যেই রওজা মুবারাক কিনা বেহেশতি এবং পুণ্য - যেভাবে হাদিস শরীফে বর্ণিত আছে।
আগেকার দিনে (অটোমান সাম্রাজ্যের সময়ে) সম্রাট রাজা বাদশাহ্রা আল্লাহ্র নবীর ﷺ পবিত্র রওজা শরীফে হীরার মতো মূল্যবান উপহার পাঠাতেন। প্রতিটি মুসলমান সেখানে 'দুনিয়ার বুকে জান্নাতের বাগানে' অন্তত দুই রাকাত নামাজ হলেও আদায় করার জন্য ছুটে ছুটে যায়। তাদের সবার পক্ষ থেকে সমস্ত উপহার গ্রহণ করে, পরিষ্কার করে, এবং উপস্থাপন করে - এই ফেরেশতারা। ফেরেশতাদের কাজই আল্লাহ্র জিকির করা, আল্লাহ্র নবীর ﷺ জন্য সালাতু'সালাম প্রেরণ করা। যে নবীর ﷺ প্রতি দরূদ শরীফ প্রেরণ করে - এই ফেরেশতারা তার সাথে তাদের নিজেদের সালাতু'সালাম এবং জিকরুল্লাহকে মিলিয়ে দেয় এবং শেষমেশ সেই সমস্ত পুণ্য উপহার নবীর ﷺ কাছে পৌঁছে দেয়। তাদের উপহার বেহেশতের যে কোন উপহারের চাইতে ৭৭ গুণে বেশি নেকির। অর্থাৎ তুমি যদি কোন পুণ্য কাজ করো তোমার পুরষ্কার হবে অন্য সব ভালো কাজের চাইতে ততগুন বেশি। তোমার উপহার তাদের মারফৎ গ্রহণ করার পর আল্লাহ্র রাসুল ﷺ তখন বলেন, ওদের দরূদশরীফের এবং মিলাদের পুরষ্কারকে ৭৭,০০০ গুণে বৃদ্ধি করে দেয়া হোক।
গ্র্যান্ডশেখ ق বলেন, তোমার দরূদশরীফকে নবীর ﷺ কাছে পৌঁছে দেয়াটা এই ফেরেশতাদের অবশ্যকর্তব্য। কেবল তাই নয়, যেই কিনা নবীর ﷺ নামে তাঁর পবিত্র রওজা শরীফের দিকে দরূদ শরীফ প্রেরণ করে তারা সেই মানুষের নামে আল্লাহ্র দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকে। প্রতি মুহূর্তে তাদের কাজ হলো তালাব-আল-মাগফিরাহ - ক্ষমার সন্ধান করতে থাকা। বাসা অথবা মসজিদ - যেখানেই মিলাদ শরীফ হয় - আল্লাহ্ এই ফেরেশতাদেরকে সেখানে পাঠিয়ে দেন। তারা সেই বাসা অথবা সেই মজলিশ থেকে সোজা আরশ-উর-রহমান পর্যন্ত ঘিরে থাকে। অর্থাৎ সেই বাসাটা অথবা সেই মসজিদটা বা সেই দোকানটা বা সেই স্কুলটা বা সেই অফিসটা - মিলাদের মাহফিল যেখানেই হোক না কেন - ওই মুহূর্তে সেটা আল্লাহ্র আরশের নিচে। যখনই তুমি মিলাদ পড়ো - দুনিয়ার বুকে তোমার বাসা - তোমার ঘর তখন বেহেশতি আলো দিয়ে ভরে যায়। বেহেশতে তোমার নামে যেই ঘরটা আছে - দুনিয়ার এই ঘরটা যেন তার প্রতিবিম্ব হয়ে ওঠে - আল্লাহ্র সামনে উপস্থিত হয়ে যায়। এগুলো আমাদের মস্তিষ্ক দিয়ে বুঝে ওঠা সম্ভব নয়। আল্লাহ্র অলি আউলিয়া এই কথাগুলো ভীষণ সহজ ভাবে বলে ফেলেন। বাস্তবে এই প্রতিটি কথার পরতে পরতে অকল্পনীয় গোপন রহস্য লুকিয়ে আছে - যা কিনা ভাষায় বর্ণনাতীত।
গ্র্যান্ডশেখ ق বলেন, কেউ যদি মিলাদে আসে, কিন্তু মিলাদে অংশ নেয়ার নিয়তে আসে নাই, শুধুই খেয়ে চলে যাবে বলে এসেছে - এমন লোকের সংখ্যা নেহাত কম না - আল্লাহ্ এমনকি তাদের কবিরা এবং সগিরা - ছোট এবং বড় সমস্ত পাপ মাফ করে দেবেন। সেই লোকটা ঘরে ফিরে যাবে নবজাত শিশুর মতো নিষ্পাপ অবস্থায়। আর এই সমস্ত কিছুই সম্ভব হয় কুব্বাত-উল-আরজাক, রিজিকের গম্বুজ - যা কিনা আল্লাহ্ শুধুই তাঁর হাবীবকে ﷺ দিয়েছেন - ওই সমস্ত মানুষকে পুরস্কৃত করার জন্যে - যারা মিলাদ-উন-নবী ﷺ উদযাপন করে - সম্মান এবং শ্রদ্ধার সাথে।
আল্লাহু আকবর কাবিরা, ওয়া' আলহামদুলিল্লাহি কাসিরা।
এতটুকু শুনেই তোমাদের কাছে মনে হচ্ছে যেন তোমরা সবাই আল্লাহ্র রহমতের দরিয়ায় ডুবতে বসেছ। সামান্য একটু খাবারের জন্য এসে কেউ যদি তার জীবনের সমস্ত পাপের ক্ষমা অর্জন করে ঘরে ফিরে যায় - তাহলে এর চাইতেও সহজ আর কি-ই বা থাকে যা কেউ চাইতে পারে? আর সেজন্যই সেই মানুষদের জন্য শুভবারতা যারা কিনা সারা বছর প্রতি দিন আল্লাহ্র নবীর ﷺ জন্য মিলাদ পড়তে থাকে। আর এই কারনেই দুনিয়াখ্যাত কাসিদাতুল-বুরদার রচয়িতা ইমাম মুহাম্মাদ আল-বুসায়রি (রা) বলেছেন, কেউ যদি প্রতিদিন মিলাদ শরীফ পড়তে থাকে - এমনকি সেটাও আমাদের জন্য যথেষ্ট নয়।